সকালে উঠেই বৌ পাকা গৃহিণীর মতো সুর করে বলল, 'ও গো, শুনছ, তুমি নারকেলগুলো একটু কুরে দিও, রান্নাটা হয়ে গেলে পাকটা আমিই করে নেবো। পরে তুমি নাহয় নাড়ুগুলো পাকিয়ে দিও।
ভারতের কাছে কাশ্মীর যা, আমার কাছে নারকেল নাড়ুও তাই। কাজেকাজেই তা নিয়ে কোনো থার্ড পার্টি তা সে কাজি কিংবা পাজি যেই হোক না কেন, কারো পাকনামি মানতে আমি নারাজ। আমি নিজে নারকেল কুরে নিই, নিজেই পাক দিয়ে নারকেল, চিনি, শুকনো দুধ, এলাচ ইত্যাদি মেশানো দ্রবণটুকু বানিয়ে, নিজের হাতে নাড়ুও পাকাই। (নিজেই খাই, অন্তত সিংহভাগ তো বটেই!) কাজেকাজেই বৌয়ের নাপাক অভিসন্ধির কথা শুনে বললাম, 'তুমি কোন পাক-স্থানের মেয়ে এয়েচ যে পাক দেবে! পাকামি করে স্বপাকের কথা না ভেবে বরং খেয়েদেয়ে ছাদে উঠে ক পাক দিয়ে এসো, তাতে পরিপাকও ভালো হবে আর পাকাপাকিভাবে শরীরটাও কমবে। তার মধ্যেই আমার পাক দেওয়া, নাড়ু পাকানো সব হয়ে যাবে। কিন্তু বৌয়েরা আর কবে সোনা ছাড়া বরের কথা শোনে! বর জোর করলে বড়জোর শোনার মেথড অ্যাক্টিং করে মাত্র। কাজেকাজেই পাকচক্রে পড়ে আমাকে ধুসস শালা বলে পাকশালা থেকে সরে এসে শালা পাক-দের খেলায় মনোনিবেশ করতে হল। মিনিট দশেক খেলা দেখার পর পাক-স্থলী থেকে বৌ চেঁচালো, 'একবার এসো তো, এ তো পেকে প্রায় লাল হয়ে গেল কিন্তু তবু পাকটা ঠিকঠাক হলো বলে তো মনে হচ্ছে না। পাকিদের বাকি খেলা রেখে আনলাকি আমি আকাবাকি করে গিয়ে দেখি বৌ খুন্তিটাকে ছোট লাঠির মতো ধরে মিশ্রণটার পেটে বেদম খোঁচাখুঁচি করছে। বললাম, 'এ কী! পাক-দণ্ডী দিয়ে বেচারা পাকটাকে অহেতুক দণ্ড দিচ্ছ কেন?' বৌ ঘৌ ঘৌ করে বলল, 'তোমার খুরে দণ্ডবৎ, এখন আমাকে ব্যঙ্গ না করে পাকটাকে কী করে পাক বানানো যায় সেটা ভাবো।' আমি বললাম, 'এ কি ঘর ওয়াপসি নাকি ডোনাল্ড ট্রাম্প! পাককে আবার পাক বানাবো কী করে!' বৌ বলল, 'দেখ না, কেমন গুঁড়োগুঁড়ো, ঝুড়োঝুড়ো হয়ে আছে, এ দিয়ে না নাড়ু পাকানো যাবে, না দামি জিনিস ঝাড়ু দিয়ে ফেলে দেওয়া যাবে!
'জব দো, জব দো' করে রাস্তাঘাটে ঝামেলা পাকানো লোকগুলোকে পুলিশ দিয়ে ঠ্যাঙানোর মতো বৌকে জব্দ হতে দেখার মধ্যেও একটা আলাদাই পৈশাচিক আনন্দ আছে।
কিন্তু সে আনন্দ তো নেতামন্ত্রীদের আয়ুর মতো পাকাপোক্ত কিছু না, বরং বায়ুর মতো অনুভব করছি কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না গোছের কিছু একটা মেমফুর্তি বটে! কাজেকাজেই আমিও হালকা Sorrow-র অভিনয় করে, বল্লুম, 'সরো তো, দেখি, কী করা যায়! আশা ছিল একটু জল দিয়ে, জ্বাল দিলেই সিন্ধুচুক্তির মতো বেঁড়েপাকা পাকটাকে ম্যানেজ করে নিতে পারব। তবে মনেমনে জানতাম, যতই মিনিট পাঁচেক অন্তর কথায় কথায় 'গো' 'গো' করে বেচারা বরদের আশেপাশে গোঁত্তা খাক না কেন, বৌ-রা মোটেও গোবেচারা হয় না। আপাতত ল্যাজেগোবরে হয়ে গেছে বলেই সিঁড়িতে বসেবসে জুলজুল করে চেয়ে দেখছে বটে কিন্তু এরপর আমিও ধ্যাড়ালে হুল ফোটাতে কার্পণ্য করবে না। তাই
খানিক সাবধানে দ্রবণটার মধ্যে বেশ খানিকটা জল ঢেলে আবার আঁচে চড়িয়ে ফোটাতে শুরু করলাম। খানিক ফোটার পরই বোঝা গেল, পাক এবার সোজা রাস্তায়, আই মিন গোটা বাঁধার মতো অবস্থার দিকে আসছে। বললাম, 'চেখে দেখো, প্রয়োজনে খানিকটা মেখেও দেখতে পারো। তোমার ঝুড়ো পাক খানিক ঘুরে এসে কেমন আঠা আঠা হয়ে গেছে।' বৌ কাছে এলে খানিক মিশ্রণ হাতে নিয়ে, পাক দিয়ে নাড়ু পাকিয়ে তার নাকের কাছে ধরলাম। 'ঘি, এলাচ এসবের গন্ধ পাচ্ছ?' বৌ নাক দিয়ে গন্ধ শুঁকল বটে তারপর 'হুহ্' বলে হুহ্কার তুলে তোয়ালে, নাইটি নিয়ে বাথরুমের দরজা বন্ধ করল। ঢোকার আগে রাগে গজগজ করতে করতে গেল, ' কুচো নিমকিতে তাহলে আমি আর হাত দিচ্ছি না!'
No comments:
Post a Comment