16/11/2015

ট্রেন জার্ণির আগে পরে

রবীন্দ্রনাথ যদি নৌকায় না ঘুরে„ ট্রেনে ঘুরে বেড়াতেন‚ বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করা ছাত্রদের আরো অনেক বেশী মাথাব্যথার কারণ হতেন‚ সন্দেহ নেই।  এত লোক‚ এত কথা! আমারই তো ট্রেনে চেপে বসলেই বাথরুম পাওয়ার মতো ইয়ে পেয়ে যায়‚ রবীন্দ্রনাথ হলে তো কথাই থাকত না।
তবে একটু হিকমত করে লোকাল ট্রেনে চাপতে হবে। এক্সপ্রেস একটু দ্রুত দৌড়ায় বটে‚ কিন্তু সেখানে স্টার জলসা‚ কিংবা শারদীয় আনন্দবাজারে পড়া চরিত্রের ভীড়। বড্ড প্রেডিক্টেবল। সেই স্বার্থপরতা‚ সেই আয়েসী চিরচেনা বাঙালিয়ানা। তারচেয়ে লোকাল ট্রেন-জার্ণি অনেক বেশী সমৃদ্ধ। তার পরতে পরতে মহাকাব্যের উপকরণ লুকিয়ে আছে।

কাটোয়া বর্ধমান লোকাল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে নলহাটি ঢুকলো। দুর্যোগের জন্যে ভীড় কম। সুতরাং জানালার পাশে গ্যাঁট হয়ে বসতে কোনো অসুবিধা হলো না। তবে একটু চাপা টেনশন থাকার ফলে উসখুস করতে লাগলাম। ভোর ৪ টেই উঠে মা চা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমার বেয়াড়া বেগ! শালা ৭ টার আগে আসবেই না। ২০ মিনিট বসার পরই বাবু এলেন। এলেন মানে "হার্মাদ" কিংবা ব্লিতস্ক্রিগ" এর মতো আবির্ভূত হলেন আর কি! কাজেকাজেই আমার মত অণু'র ল্যাট্রিনে প্রবেশ ঘটলো।  ঢুকেই চিত্তির! একেই তো প্যানের অবস্থা কহতব্য নয়। আগের জন নিশ্চিন্তে পরের জন(দুর্ভাগ্যক্রমে আজ আমি) এর উপর "স্বচ্ছ ভারতে"র দায়িত্ব চাপিয়ে কাল্টি মেরেছেন। সে না হয় "সকলের তরে সকলে আমরা …প্রত্যেকে আমরা" আউড়াতে আউড়াতে ম্যানেজ করলুম। কিন্তু ইকি! ছিটকিনি ফিটকিনি'র বালাই নেই যে! আমার যে বেশ খানিকটা সময় লাগবে। একটা পুরো সিগারেট শেষ হতে কমসে কম ৫/৭ মিনিট‚ তারপর আবার নিজেকে সমেত ভারতকে স্বচ্ছ করার ল্যাঠা। হে বাবা মদন‚ হে মা রতি‚ ই কী গভভো যন্তনায় ফেল্লে! হোস্টেল লাইফ হলে ডিউরিং দ্যাট পিরিয়ড  চেঁচিয়ে গান করার চল ছিল। এখানে ট্রেনের তুরুকদুমে সেটাও কাজে লাগবে বলে মনে হয় না। এক হাতে প্রজ্বলিত সিগারেট‚ অন্য হাতে দরজা‚ উফফ!

বার তিনেক দরজায় টোকা পড়লো। চতুর্থ বার টোকার পরিবর্তে ধাক্কা। আরো মিনিট তিনেক পর‚ যখন আমার ইয়ে পুরো ইয়ে হয়ে গেছে - আই মিন সব কমপ্লিট। প্যান্টটা পরতে পরতেই দরজায় হাতের ছিটকিনি আলগা করে দিলাম। এক জবরদস্ত গোঁফের ভদ্রলোক ঠেলে ঢুকেই ইসসসস বলে বেড়িয়ে গেলেন। আমি বাইরে যেতেই ''দরজা আটকে ইয়ে করতে পারেন না? যত্তসব আনসিভিলাইজড!" বলে ঘোত্‍-ঘোত্‍ করে ঘোত্‍কার দিলেন। ইংরেজি না বল্লে ক্ষমা করে দেওয়া যেত। কিন্তু ব্রিটিশ ব্যাটারা এককালে খুব জ্বালিয়েছে। তখন জন্মালে নির্ঘাত বিপ্লবী হতাম। এখন সমস্ত রাগটা গিয়ে ওই গুঁফো ভদ্দলোকের উপর গিয়ে পড়লো। মনেমনে বল্লুম‚ দাঁড়াও‚ চাঁদ। আমি বাঁড়ুজ্জে‚ আমাদের দিদিও বাঁড়ুজ্জে। তার মানে লতাপাতায় আম্মো গর্মেন্টের লোক। আমার সাথে কুর্দিশদের মতো কুর্দানি!  কিন্তু মুখে বল্লুম‚ "দুঃখিত!
পলাশীর যুদ্ধের পর ক্লাইভের মুখের মতো মুখ করে তিনি ঢুকলেন। তারপর মিনিট দুয়েক খটর খটর‚ মানে ছিটকিনি লাগাবার ব্যর্থ প্রয়াস করলেন‚ তারপর হতাশ হয়ে আধখোলা অবস্থাতেই শুরু হয়ে গেলেন। আরো মিনিট খানেক অপেক্ষা করে আমি দরজায় জোর ঠেলা লাগাতেই দরজা খুলে গেল। ওই দশাসই ভুঁড়ি নিয়ে দরজা আটকে রাখার সাধ্য কি আর সকলের হয়? গুঁফোবাবুর পুরো তৈলঙ্গস্বামী হয়ে কাজ সারছিলেন‚ আচমকা আক্রমণে ভেবলে গিয়ে "কি কেন কে ইত্যাদি প্রশ্নবোধক একসাথে বলতে গিয়ে জট পাকিয়ে "ক্কক্কিকেকো" জাতীয় কিছু একটা আওয়াজ বের করলেন। কূল রাখবেন‚ না মান রাখবেন ভাবতে ভাবতেই মিনিট খানেক খতম। আমি গ্লেন ম্যাকগ্রাথ‚ শোয়েব আকতার‚ যাত্রাপালায় দেখা আরঙ্গজেব প্রভৃতি বিষাক্ত হাসির মালিকদের যাবতীয় ক্রূরতা ঠোঁটে এনে হাসলাম। অতীতের গল্পগাথায় বামুনের দৃষ্টিশক্তিতেই সব ভষ্ম হয়ে যেত। একটু ম্লেচ্ছাচারী বলে কি সব শক্তিই হারিয়েছি নাকি! ভদ্দলোক পুরো ছাই আই মিন বাউলিয়ে গেলেন। দরজাটা আবার লাগিয়ে দেওয়ার আগে ছোট্ট করে বল্লুম‚ দরজাটা লাগিয়ে ইয়ে করতে পারেন না? অসভ্য!"

প্রতিশোধের একটা আশ্চর্য তৃপ্তি আছে। মনটা বেশ গৌতম বুদ্ধ টাইপের হয়ে গেল।  পাশের সিটে দুই আদিবাসী মহিলা গল্প করছেন। পুনরাধুনিক কবিতার মতো আমি শুধু 'দাকা' আর 'বাং' ছাড়া কোনো শব্দের অর্থ বুঝতে পারলাম না।  ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন ভোলে ব্যোম ঢুকে কামরাটাকে গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে দিলেন। দুজন মহিলা ভক্ত আচার সহযোগে মুড়ির পুঁটলি'র গুষ্টির পিন্ডি চটকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাদের দুজন পুরুষ সহযোগী দরজায় দাঁড়িয়ে একবার গাঁজার কলকের দিকে‚ একবার অনাগত টি.টি'র দিকে মনযোগ দিলেন।

আমার চোখ একটা খেলনাওয়ালার লাল জিনের প্যান্টে ধাক্কা খেয়ে‚ এক কলেজ ছাত্রের ব্যাগের "গোল্ড বেল" লেখা স্টিকারে প্রতিফলিত হয়ে মিটার দশেক দূরে এক জোড়া চোখের সামনে গিয়ে ক্যাঁইইইইচ করে ব্রেক মারলো।

আহা! কী চোখ!  কৌলিকী পূজামন্ডপে যেমন দেবী মূর্তি বানানো হয় - তেমনি প্রশস্ত‚   কাব্যিক বর্ণনা অন্যদের জন্যে তোলা থাক। সেই টোপা কুলের মত মতো চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই নোয়াদার ঢাল পেরিয়ে গেল। হঠাৎ খেয়াল হলো কাজটা একটু ইয়েই হয়ে গেল। আদেখলার মতো একটু বেশীক্ষণই তাকিয়ে ফেলেছি। এবং শুধু চোখ নয়‚ চোখের মালকিনের দিকেও যে এক আধটু তাকাই নি তাও নয়। তবে এঁটো মদের দিব্যি‚ পাপদৃষ্টিতে তাকাই নি। মা দুগগার মতো চোখ‚ পরণে যদি টপ আর জিনস না হয়ে একখান লাল পেড়ে গরাদ হতো‚ তাইলে পুরো আধ্যাত্মিক কেস ! আমার মতো অসুরও এইসব ভাবছিল। কিন্তু অন্যপক্ষ আমার এই মাতৃজ্ঞানে তাকানো'টাকে ঠিক পুত্রজ্ঞাণে নিলেন কি না‚ বোঝা গেল না!
তাকাবো না তাকাবো না মনে করেও তাকিয়ে ফেল্লাম। বুঝলাম চোখের একটা স্বতন্ত্র ইচ্ছা আছে। তার উপর আমার হাত নাই।

ট্রেনের ঝাঁকুনিতে নাকি গতরাত্রে সেবিত সোমরসসিক্ত আমার নটখট মনের কৃপায়‚ জানিনা‚  চোখের মালকিন ইঙ্গিতপূর্ণ মাথা নাড়ালেন।  লাহলবিলাকুবত! মা শেয়ালেশ্বরী! কী সব টাইফয়েড মা?
হেডফোনের তালেতালে পা নড়ছে। মাথাও সেইরকমই কোন ঐশ্বরিক প্রভাবে নড়ে থাকবে!

মনটাকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার জন্যে খবরের কাগজে মন দিলাম। অক্সর প্যটেল নামক কোনো ক্রিকেটারকে নিয়ে গাভাসকার কিছু বলেছেন। কোন মন্ত্রী জ্যোতিষীর সাহায্যে নিজের কিচাইনোত্তর হালত্‍ ফেরাতে উন্মুখ। ধুর!!!

হঠাৎ কাশির শব্দ হলো। প্রিমিয়াম হুইস্কিতে এত নেশা হয় না আজকাল। সুতরাং কাশির শব্দটা জেনুইন‚ আমার মদী'য় চিন্তাভাবনার ফসল নয়। মুখ তুলতেই সেই চোখের সাথে চোখাচোখি হলো। লক্ষ্য করলাম‚  দৈবস্বরুপিণীর ভুরু কুঁচকে একবার উপরে উঠলো‚ তারপর নীচে নামলো।
জয় বাবা আশারাম‚ জয় বজরঙ্গবলী! আমার মত বাল … আই মিন বাল ব্রহ্মচারী'র সাথে ই তোমার কী তুরঙ্গম ফাজলামো!  আমি তেমন কোনো জবরজং হনু নই‚ বাবা। একেবারে সাদাসিধে গাঁইয়া ল্যাদাগোবরিয়্যাম। আমাকে ই রকম পরীক্ষার ডোবায় চুবিয়ো না‚ বাপ।

মা দুগগার পাশে যেমন লক্ষ্মী‚ সরস্বতী‚ ইঁদুর‚ পেঁচা থাকে‚
ক্রমশঃ চোখের মালকিনের আমন্ত্রণে আরো কয়জন সহচরী তামাশা দেখার বাসনায় তার পাশে এসে বসলো।  বড় ছোট কুতকুতে বিভিন্ন চোখের সম্মিলিত দৃষ্টিক্ষেপণে মনেমনে প্রমাদ গুণলাম। শেষে গতবারের নবান্নের সময় দুর্গামন্ডপে অভিনীত যাত্রাপালা কে.খুঁ.কে না হয়ে যায়!

স্মার্টনেসের সাথে আমি তো ছাড়‚ আমার বাপ ঠাকুদ্দারই কোনো সম্পর্ক নেই। অগত্যা উদাসীন হওয়ার ভান করে বৃষ্টি দেখতে লাগলাম। মনে ড্যামড্যাড্যাড্যাম‚  ড্যামড্যাড্যাড্যাম করে ঢাক বাজছে। আমি বহু কষ্টে সেই বাজনাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছি। একবার চট করে ল্যাট্রিন থেকে ঘুরে এলে মন্দ হয় না। না কি ঝালমুড়ি খাবো! শেষমেষ "ওংকার ভুর্ভুবস্য তস্যবিদুতবঅরেনং"এ শুরু করে  "জবাকুসুমসংকাশং কাশ্যপেয়ম মহাদ্যুতিম"  "অখন্ডমন্ডলাকারম ব্যপ্তম যেন" হয়ে "ওং চিত্‍পিঙ্গল হনঃ হনঃ দহঃ দহঃ" অর্থাৎ যেকটা সংস্কৃত মন্ত্র ছেলেবেলায় শিখেছিলাম‚  সবকটা আবৃত্তি শেষ করে ফেল্লাম। তাতে অবস্থা একটু কমলো বটে‚ কিন্তু সম্পূর্ণ ভয় গেল না। আর কোনো মন্ত্রও মুখস্থ নেই। গত্যান্তর দেখে ক্লাস ফোরের শেখা " বিসমিল্লাহির রহমানেরাহিম … লা রাব্বিলেয়ালামিন" টাও একবার আওড়ে নিলাম। কে বলে প্রার্থনার জোর নেই? দিব্যি ইয়ে ফিল করছি এবার।

বুকভরা সাহস নিয়ে মুখ তুলে চাইতে যাবো‚ হঠাৎ দেখি - সহচরীদের মধ্যে একজন এগিয়ে এলো। "দাদা‚ নিউজপেপারটা একটু দিন তো। এস এস সি'র খবরটা …"
একটা শক্ত কফের টুকরোকে ফেলে দেওয়ার আগে জিভে নিয়ে জাগল করছিলাম। দীর্ঘ মৌনতার পর হঠাৎ কথা বলতে গিয়ে কোঁত্‍ করে সেটা গিলে ফেল্লাম। মাথাটা "ইয়েস স্যর" বলার ঢং এ নড়ে উঠলো।
গল্প এইটুকুই। বর্ধমানে নেমে যাওয়ার পর সেই বড় চোখের  মালকিন ধন্যবাদসহ কাগজটা ফেরত্‍ দিয়ে গেলেন। একটু আশাহত হলাম বটে‚ কিন্তু অস্বস্তিটা কাটলো।

ঘন্টাদুয়েক পরে গোলাপবাগের একটা চায়ের দোকানে বসে চাসহযোগে খবর কাগজ খাচ্ছি। হঠাত্‍ দেখি‚ খেলার পাতায় বেশ জড়ানো অক্ষরে লেখা

My whatsapp no - 9734 -374***
তারপর একটু নীচে লেখা - afreen

স্টার দেওয়া সংখ্যা কটার জায়গায় সত্যিসত্যি স্টার ছিল না। তিনটে সংখ্যাই ছিল। টোটো'র সামনের সিটে বসে স্টেশন থেকে গোলাপবাগ আসার পথে বৃষ্টির ফোঁটার কল্যাণে শেষের ডিজিট তিনটে পুরো ধেবড়ে গেছে।

No comments:

Post a Comment