বাবা বল্লেন, 'যেমন কর্ম, তেমনি ফল।' মা এইসব শুনে হেসে কুটোকুটি, 'তোর বিচার করার শখ মিটলো তো, বাবু?'
আমার ঘোর তখনো কাটেনি। টিউবয়েলে পা ধুতেধুতে আমি তখনো ভাবছিলাম সারাদিনটা আজ কী নাটকই না হলো!
সাতসকালে গ্রামের চলমান গেজেট মীরা-পিসি'র মুখে, অহল্যা'দির শেখপাড়ার কুতুব'চাচার সাথে ধরা পড়ার খবরটা শুনেই মেজাজটা খিঁচড়ে গেছিল। আপনাআপনি মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল - উফফফ! নট এগেইন। স্কুল থেকে ফিরে ভেবেছিলাম, বিকেলে একটু খেলার মাঠে যাব, কিন্তু তা আর হবার নয়। অ্যাজ ইউজুয়্যাল - অহল্যাদির শ্বাশুড়ী ক্লাবে বিধবা বৌমা'র নোংরামি'র বিচার চেয়ে দরখাস্ত দেবেন। আর ক্লাবের গেম সেক্রেটারি হিসেবে আমাকেও বাধ্যতামূলকভাবে কটা অশিক্ষিত গ্রাম্য মোড়লের সাথে বসে পরকীয়া'র বিচার করতে বসতে হবে। দুত্তোর!
স্কুলে আসার আগে দেখলাম, ঘাটে স্নানরতা মামাসি'দের ভীড়টা অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশীই জমাট। লালচাঁদের চায়ের দোকানে সকাল ১০টাতেই সন্ধ্যের ৭ টার ব্যস্ততা।
#
স্কুল থেকে ফিরেফিরেই চাট্টি নাকেমুখে গুঁজেই বিচারসভার উদ্দ্যেশ্যে ছুটলাম। ক্লাবের বারান্দার চারিদিকে প্রায় শখানেক নারীপুরুষ, কিন্তু তা সত্বেও পিনড্রপ সাইলেন্স চারিদিকে। শুধু পঞ্চায়েত প্রধান নগেনবাবুর কচমচ করে পান চেবানোর আওয়াজ আসছে। মহামান্য বিচারপতি'রা অর্থাৎ মিলমালিক শিবুজ্যেঠু, গ্রামের লাইব্রেরিয়ান্ সাদেক'চাচা, পোস্টমাস্টার কাম বড় মন্দিরের পুরোহিত নগেন চক্কোতি, আর ক্লাব কমিটির পক্ষ থেকে সেক্রেটারি সুকান্ত'দা, আমি, আর কালচারাল সেক্রেটারি বুবলা।
বিচারের কাজ শুরু হওয়ার খানিকক্ষণের মধ্যেই একটা কথা স্পষ্ট হয়ে গেল, একে তো পরকীয়া, তারপর আবার হিন্দু বিধবা'র সাথে এক বিবাহিত মুসলমানের, অর্থাৎ
এ অপরাধের সীমা পরিসীমা নেই।
আর শাস্তিস্বরূপ যদি দুজনের মাথাটাও কেটে নেওয়া হয়, তাতেও বোধহয় শাস্তির মাত্রাটা খানিকটা কমই থেকে যায়।
আমি গাঁইগুঁই করে অহল্যা'দির পক্ষে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ পাঁজরে খোঁচা খেয়ে থামতে গিয়ে বিষম খেয়ে হেঁচেকেশে একাকার। দেখলাম, বুবলা মুখটাকে আমার কানের কাছে এগিয়ে আনছে।
"চুপ মার বে। তোকে কিছু বলতে হবেনা। একবার অহল্যাদিকে মুখ খুলতে দে, দ্যাখ জমে ক্ষীর হয়ে যাবে। বিচার ফিচার সব …'
ভয়টা যে আমারও ছিল না, তা নয়। অহল্যাদি যেমন সাহসী, তেমনি মুখরা। কুতুবচাচার বাড়িতে কাজ করত। সেখান থেকেই প্রেম। এ ওপেন সিক্রেট তো এলাকার সবাই জানে। এখন অহল্যাদি সারাদিন কুতুবচাচার প্রতিবন্ধী স্ত্রীর দেখাশোনা করে। গোরুদের খড়জল দ্যায়। সমাজসংস্কার কাউকেই বিশেষ পাত্তাটাত্তা দ্যায় না। তাছাড়া ওর ওই মুখরা স্বভাবের জন্যে কেউ ওকে তেমন ঘাঁটাতেও সাহস করে না। কিন্তু তাইবলে এই নিষ্ঠুর সমাজপতিদের সামনেও কি আর ততটা প্রতিবাদী হতে পারবে?
এইসব ভাবছি আর পেছন থেকে বুবলা'র টুকিটাকি কমেন্টগুলোর আফটারএফেক্ট হিসেবে ভেতর থেকে ভসভসিয়ে ওঠা হাসিটাকে চাপার চেষ্টা করছি। আমার এই এক মহাসমস্যা, ভয়ঙ্করতম সিরিয়াস পরিবেশেও হাসি পাবে। আর সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে সত্যব্রতে'র দাওয়াই। কখনো ভাবছি, পরপর ছ বলে ইন্ডিয়ার ছখানা ইউকেটে পড়ে গেল, স্কোরবোর্ডে মাত্র ৯রান। কখনো ভাবছি, পকেটমার হাজার দশেক টাকা, এ.টি.ম কার্ড, লাইসেন্সসহ আমার পার্সটাকে ঝেড়ে দিয়েছে।
ওদিকে সাদেকচাচার গলা সপ্তমে উঠে গেছে - "লাহলবিলাবুয়ত্ কুতুব মিয়া, তুমাকেও বলিহারি যাই হে! না পুষাছে তো আবার নিক্যা করো। তালয় যত্তসব হারাম আর নাপাকের দিকেই লজর! তাও মেনি লিয়্যা যেতো যদি কিত্যাবিয়া হতো। নিজের আখিরাতের কথাটোও একবার ভাবল্যা না হে?"
নগেন চক্কোত্তি ভাবছিলেন, সাদেকচাচার আখিরাতের পাল্টা হিসেবে কোন সংস্কৃত শ্লোক কোট করা যায় কিনা? কিন্তু প্রত্যেকবারের মত এবারেও বেয়াড়া সংস্কৃত ভাষাটা প্রয়োজনের সময় বেইমানি করল। কাজেকাজেই তিনি - "যুগধর্ম হে, যুগধর্ম ! ছি ছি ছি!" বলেই থেমে যেতে বাধ্য হলেন। দেখলাম, অহল্যাদি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, পাড়ার এক বৃদ্ধা তার শাড়িতে টান মেরে তাকে বিরত করলেন।
"ধর্মের কথা ইসব নুংরাগুলাকে শুনিং কি লাভ হে ঠাকুর?' কোন এক অজ্ঞাত কারণে শিবুজ্যেঠু একটু বেশীই হিংস্র, 'আগে দুজুনার বয়ান ল্যাও, তারপর পঞ্চজুনার সম্মুখে অ্যাক্টো এমুন শাস্তি দিতে হবে, যেন …
"আপনারা মাতব্বর মানুষ, যে বিচ্যার করবেন মাথা পেতি লিব। কিন্তু অ্যাক্টো ব্যাপার ভেবি দ্যাখেন, এই ম্যাওরা ছেলাটোকে, অর না'পারা মা'টোকে দ্যাখার লেগি তো লোকের দরকার আছে। আর তাছাড়া কদিন পর হামারও বয়েস হবে, একটো মেয়্যাছ্যেলা ছাড়া …
কুতুব চাচার কথা শেষ না হতে না হতেই লাফিয়ে উঠলেন সাদেকচাচা আর শিবুজ্যেঠু। উভয়ের হাতেইদামী চামড়ার চপ্পল।
'মেরি মুক ভেঙি দিব, শালা শুয়ার্। মেয়্যা পারেনা বুলি হিন্দুর মেয়্যার দিকে হাত বাঢ়াবি? আমাদের ছেল্যামেয়্যা ইসব ঢলাঢলি দেখি ই মাগির মুতুন ঢলানী হবে? '
'মারেন, হামি বুলছি, মেরি শালা হাবিয়ার কীটের মুখের চামড়া পাল্টায় দ্যান, শিবভাই। হামাদের হাদিশে তো বুলে এইসব হারামির ইটোকেই কেটে লিয়্যা দরকার।'
নগেন্দ্র চক্কোত্তি'র আবার মনে পড়লো না, মনুসংহিতায় এই অঙ্গকর্তন সম্পর্কে ঠিক কী বলা আছে। অগত্যা আবার সেই - "ছি ছি ছি! বলে ছিত্কার করেই তিনি নাক খুঁটতে লাগলেন।
আর বোমা'টা ঠিক তখনই ফাটল। পেছনে বসা বৃদ্ধার হাত থেকে আঁচলটা হ্যাঁচকা মেরে টেনে নিয়ে অহল্যা'দি উঠে দাঁড়ালো। কালো মুখ রাগের চোটে আরো কালো হয়ে গেছে।
'কিসের ছি ছি কচ্ছেন, ঠাকুরমশাই? কি কোরাছ্যি আমি? চুরি কোরাছ্যি, নাকি ডাকাতি কোরাছ্যি? '
আঁচলসমেত বুকটা হাপরের মত উঠছে আর নামছে। পেছন থেকে ফিসফিস করে বুবলা বল্ল 'ডুইইই! অ্যাকশন স্টার্টস।'
'শুনো মেয়্যা, অ্যাতো বড় অল্যায় করিউ বুলছো, কি কোরাছ্যো! তুমার তো বুকের পাটা কম লয় গো!'
'জযপা আমার খানিক বেশী, তা ই গাঁয়ের সব মাগি মিনস্যা জানে। কিন্তু বুলুক ধিনি কেহু, কাহুকে অলায্য ভাষা বুলাছি। দ্যাখেন, আমার ভাতার নাই। অর ও বো'টো থেকিও না থাকা। উ আমার খরচ চালিং দ্যায়, প্যাটের খিদা মিট্যায়, গতরের খিদা মিট্যায়। আমি ওর সঙ্গে থাকি, ব্যস। অ্যার.বাহিরে আর কথা নাই। আমি মন্দিরে যায়ন্যা, মিজানের বাপও মসজিদে যায়ন্যা। আমাদের দুগগাপুজ্যাও নাই, রিদও নাই। কারুর সঙ্গে কুনু লিয়্যাই নাই। মিটি গেল।
এত সহজে ব্যাপারটা মিটে যাবে, তাহলে আর গ্রাম্য সমাজপতিদের ভিতরের বাঘটা তৃপ্ত হবে কি করে।
'তু বুল্লেই মিটি যাবে নাকি রে, কসবি?' শিবুজ্যেঠু চপ্পল হাতেই রুখে দাঁড়ালেন। 'তোদের দুট্যাকে আজ মাথা ন্যাঢ়া করি, ঘোল ঢেলি, তবেই ছাড়ব।'
" ওরে আমার কুন সাতকূলের ধ্যাগোর এলেন রে। আমি কসবি হলে তোর মা কসবি, তোর জুয়ান বিটি কসবি, তোর চোদ্দপুরুষ কসবি রে, ঢ্যামনা! ন্যাঢ়া করবে! আয়, কুন মরার সাহুস আছে এগিং আয়।'
শাড়ির ভিতর থেকে হঠাত্ একখান কাস্তে বের করল অহল্যাদি। নগেন চক্কোত্তি পিছিয়ে আসতে গিয়ে সাদেকচাচার পা মাড়িয়ে দিলেন। আমার পেটের ভিতর থেকে আবার সেই সোডার মত কী একটা ভসভস করে গলায় উঠে আসছে। আমি ভাবছি, বাবা মারা গেছেন, মা ভীষণ কাঁদছেন। ভাবছি, একটা বনবেড়াল আমার গা থেকে খুবলে খুবলে কাঁচা মাংস খাচ্ছে।
'কসবি বুলছে, কসবি? হারামি, আগেরবার পুজ্যার রাতে এই কসবিটোর সঙ্গে শুয়া'র সুময় মুনে ছিল না? সারারাত ধরি ধামসাধামসি করার সুময় মুনে ছিল না?
বুবলা বল্ল - 'বোলড!
আমি ভাবছি - ভূমিকম্পে শুধু আমাদের বাড়িটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি ফাঁকা রাস্তায় বসে সিগারেট টানতে টানতে কাঁদছি।
"আর সাদেক মিয়া', অহল্যা'দির কাস্তের ডিরেকশন চেঞ্জ হলো। 'তুমি তো হাজী, খুব ভালো মানুষ , তাহলে তুমার ওই না'পারা ভাইটোর বহু'র সাথে শুং থাকো ক্যানে? জমিজমাগুলা লিল্যা, ভাইটোর বহুটোকেও লিল্যা, আর আমাকে শাসুন কত্তে আলছ? সরুম লাগেনা ?'
আবার সদ্য ঝড়ের পরের নীরবতা। বিচারপতিরা হঠাৎ করে যেন মাটির ভিতরে লুকিয়ে থাকা ধনরাশির খোঁজ পেয়ে সেটা নিয়েই মগ্ন। মুখ তুলে অন্যদিকে চাইবার অবকাশও তাদের নাই।
আমি ভাবছি, কলগেট পেস্ট ভেবে আমি ঘায়ের মলম দিয়ে দাঁত মেজে দিয়েছি। আমার একশ পঁচিশ বার বমি হয়েছে, সাতাত্তর বার পায়খানা।
'চল গ, কুড়্যার মুতুন বসি থাকলে হবে? মিজনা'র মাকে অসুধ দিয়্যার টাইম পেরিং যেছ্যে যি।'
কুতুব সেখের বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে অহল্যাদি হাঁটতে শুরু করলো। পিছনে বাধ্য ভালোমানুষের মত কুতুব সেখ।
আমি বুবলার সাথে সতরঞ্জি গুটিয়ে রাখতে ভাবছি, একটা বড় ধুমকেতুর সাথে ধাক্কা লেগে পৃথিবীর অর্ধেক অংশটা ধ্বংস হয়ে গেছে। সবাই মরে গেছে, শুধু আমি একটা গ্রহানুপুঞ্জের সাথে বাঁইবাঁই করে পাক খাচ্ছি।
No comments:
Post a Comment