আমার স্মৃতি মানে স্কুলপালানো দুপুর, আমপোকা, আর তাদের হিরণ্ময় ডানায় যেটুকু মার্চের রোদ। আমার স্মৃতি মানে যত্ন করে তুলে রাখা ধুতি-পাঞ্জাবিতে পাকা পেয়ারার গন্ধ, ডাঁটাভাঙা চশমা, বাথরুমের পাশে অনাদরে পড়ে থাকা অভিমানী চামড়ার চপ্পল। স্মৃতি মানে - পুরোপুরি মা, যার অর্ধেকটুকু এখনো নড়েচড়ে বেড়ায়। রান্না করে। টিভি সিরিয়ালের চরিত্রদের সমস্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়।
স্মৃতি মানে - মলিন ধুতিপাঞ্জাবি পরা একজন প্রাথমিক শিক্ষক - চাষী পরিবারের ছাত্রদের টিউশন পড়িয়ে, মাইনে বাবদ ভাতের চাল নিয়ে আসবেন। তারপর সেটা রান্না হলে, তার ছেলেমেয়েরা তাই খেয়ে আবার স্কুলে যাবে।
তবুও আমার কাছে স্মৃতি ঠিক বিষাদ নয়। বরং হলুদ জবাপাতা, হায়রোগ্লিফিক কিংবা প্রত্যন্ত কোরাল। কিংবা বিশ্বাসের মত অকারণ - আছে তাই আছে।
এমন স্নিগ্ধ হয়ে তার মাথাটুকু জেগে আছে - যেন ঘাট, অথবা কবিতা
শব্দ হলে মনে হয় - ঠাকুমা বুঝি ডাকনাম ধরে ডাকছেন। শব্দ হলে মনে হয় - পাশের পুকুরের উঁচু পাড় থেকে জলে পড়ে গিয়ে ঠাকুরমা গোঙাচ্ছেন। খবর পেয়ে ছুটে গিয়ে তাকে আমিই তুললাম তখনো তার উষ্ণতায় জোয়ানের গন্ধ। সকলে বল্লো - আত্মহত্যা।
আমার কেন জানিনা মনে হয়েছিল- আদর করছেন।
সারাদিন যেমন চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে যেতেন। চোখে ঝাপসা দেখতেন - তাই সদাসর্বদা কানখাড়া করে রাখতেন। যেন - সমস্ত শব্দের এক এবং একমাত্র লক্ষ্য তাকে ফাঁকি দেওয়া, আর সেই আপাতচালাক শব্দাবলীর এই গোপন অভিসন্ধির কথা হঠাৎ করে তার কাছে যেন ফাঁস হয়ে গেছে।
ঠাকুরমা মারা যেতে পারেন, পাশের বাড়ির কাকিমা মারা যেতে পারেন, আমার সমবয়সী মাসির ছেলে জলাতঙ্ক হয়ে মারা যেতে পারে। কিন্তু তাই বলে - বাবা!
উহু, অসম্ভব। দীর্ঘদেহী বাবা কপালে চন্দনতুলসী আর এক টাকার কয়েন লাগিয়ে শুয়ে আছেন, এই ভাবনার চেয়ে হাস্যকর আর কিছু ছিল না।
সুপারম্যানরা মরেন না। তারা ১০ কিমি হেঁটে যেতে পারেন। দশ মিনিটের মধ্যে সংস্কৃত মন্ত্রের ছন্দ ধরে রেখে বাঙলা তর্জমা করে পড়ে শোনাতে পারেন। আমার ঘুম থেকে জাগার বহু আগে উঠে ছোট্ট ঘরটাই বসে পুরনো খবরের কাগজ পড়তে পারেন। গ্রীষ্মের দুপুরে আমাকে ধরবেন বলে ঘুমন্ত শিশুর মত মটকা মেরে পড়ে থাকতে পারেন। পরে আমি বোকার মতো ধরে পড়ে গেলে - টেরিফিক রকমের পেটাতেও পারেন। সাহু মেওয়ালালের সাথে তার আলাপ আছে। তার পড়ার ঘরে কত্ত কত্ত বই। কত্ত লোক আসে, শ্রেণীসংগ্রাম, সাম্যবাদ, শ্রেণীশত্রু ইত্যাদি অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে। প্রতিদিন ভাতের চাল বিক্রি করে তাদের জন্যে চা চিনি আনতে হয় বলে মা রাগ করেন। তিনি পরিমিতিও জানেন, আবার এম.এ ইংরেজির ছাত্ররাও তার কাছে কী কী সব জটিল জিনিস পড়তে আসে।
সেই বাবাকে কোলকাতা নিয়ে যাওয়া হবে। হৃদপিণ্ড
বন্ধ হয়ে যেতে চলেছে। পেসমেকার নামের কিছু একটা লাগাতে হবে - যার নাকি অনেক দাম। নাহলে বাবা মরে যাবেন। সবাই খুব কাঁদছে। আমার কিন্তু দারুণ লাগছিল। কত্ত লোক এসেছে বাড়িতে, মাসি'রা, পিসি'রা, সক্কলে আমাদের জন্যে কত কী নিয়ে এসেছে। একটা উত্সব উত্সব আবহ।
কদিন পরেই আমার প্রত্যাশা মতো বাবা ফিরে এলেন। কী সুন্দর লাগছে বাবাকে দেখে। একটু যেন ফর্সাও হয়েছেন! আর একটু একটু আস্তেও যেন কথাবার্তা বলছেন। আমার কেমন অস্বস্তি লাগলো কদিন। কেমন যেন অচেনা লাগছিল বাবাকে। জামায় আর আগের মত পেয়ারার গন্ধ নেই, তার পরিবর্তে কিরকম যেন ওষুধ ওষুধ গন্ধ। বাবা বল্লেন - ভিটামিন বি'এর গন্ধ।
কিছুদিন এমনিই গেল। তারপর আবার কদিনের মধ্যেই বাবা সুপারম্যান হয়ে গেলেন। আবার চেঁচিয়ে স্তোত্রপাঠ করতে শুরু করলেন। আবার হেঁটে মিটিং এ গেলেন। ছোট ভাইকে নিয়ে শান্তিনিকেতনে ভর্তি করতে গেলেন। সেখান থেকে প্রান্তিক পর্যন্ত হেঁটে এলেন। তারপর …
…তারপর … মরে গেলেন। কাকাদের ল্যান্ডফোনে কাকার বড়ছেলে ফোন করে জানালো - "বড় বিপদ হয়েছে। জ্যেঠুর শরীর খারাপ।''
জানিনা কেন মনে হলো - সুপারম্যান আর নেই। বল্লাম - "বাবা মরে গেছে, বল?" ওদিক থেকে উত্তর এলো -"হ্যাঁ, তাতা এখনো অসুস্থই জানে। ওকে বলা হয়নি এখনো কিছু। আমি কিভাবে রিয়্যাক্ট করব ভাবছিলাম। সিনেমায় দেখেছি, হাত থেকে ফোন খসে পড়ে যায়, তারপর চেঁচিয়ে ওঠার সাথেসাথেই ব্যাকগ্রাউন্ডে মেঘ ডেকে ওঠে। আমি চুপ করে রিসিভারটা নামিয়ে রাখলাম। আমার সামনে তখন মা দাঁড়িয়ে। অর্ধেকটা নয়, পুরো মা'টুকুই।
ফোন রেখে বল্লাম - বাবা মরে গেছে। দিদির ফিটের অসুখ, সাথেসাথেই অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। আমি একদৃষ্টে মা'কে দেখছিলাম। মা কাঁদলো না। পাথরের উপর শাঁখাপলা আছড়ে ভেঙে ফেলল না। কেবল যেন মনে হলো - আমার চোখের সামনে অর্ধেকটা মা'ও যেন মরে গেল।
#
এখন বর্তমান মানে ঘুম ভেঙে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতেযেতে দেখি - একটা ছাইরঙা পাঞ্জাবি পরিহিত বাবা পাশের ঘরে খবরের কাগজ পড়ছেন। যতক্ষণ না আমার চটক ভাঙে, যতক্ষণ না আমি কলতলা থেকে উপরের ঘরের দিকে বাবাকে দেখার জন্যে তাকাই - ততক্ষণ পর্যন্ত পড়েন। কিন্তু ভালো করে তাকালেই - বাবা মরে যান।
এখন বর্তমান মানে - একা বসে থাকলেই নিশ্চিত শুনতে পাবো, ঠাকুরমা মা'কে (অর্ধেক মা'কে নয়, আস্ত মা'কে) ডেকে বলছেন - "ও বড়বৌ, তোমাকে যে বারবার বলি, মুড়িতে খুব ঝাল হবেনা এমন একটা লঙ্কা দাও না কেন?'
No comments:
Post a Comment