29/12/2025

অবিশ্বাসীদের

কবিতা লিখেই ক্ষান্ত হননি 
খেলেছেন তিনি ক্রিকেটও
তার প্রতিভার কাছে নজরুল 
রবীন্দ্রনাথও ফিকে তো!

তার সাথে কোনো তুলনা হয় না
শচীন,  সোবার্স, বোথামের।
একাই একশো আগলে বঙ্গ
 ব্যাটমান যেন গোথামের। 

 ফুটবলে তিনি গোল করেছেন
লড়েছেন তিনি ডুয়েলে
সরে গিয়েছেন বিদ্যুৎগতি
বুলফাইটের ঢুঁ এলে! 

এঁকেছেন ছবি, লিখেছেন ছড়া
ফুঁ-ও দিয়েছেন বাঁশিতে
একতারা ধরে গান তুলে দেন
এখনো হাসিতে হাসিতে।

এইসব ডাঁহা মিথ্যে যে নয়
বলেছেন খ্যাতনামারা
সভাকবি,  নেতা, বুদ্ধিজীবীরা
কিংবা তাদের মামারা

পেপার ক্লিপিংয়ে রেখেছে সাক্ষ্য 
টিভির চ্যানেলে চ্যানেলে
কেউ পেড, কেউ আনপেড, তারা
যত এক্সপার্ট প্যানেলে

অকাট্য কত যুক্তির প্যাঁচে
পেড়ে ফেলেছেন বিরোধী 
আম জনতাও নিয়তির মতো
মেনেও নিয়েছে চিরদিন 

যে রাঁধে, সে চুল বাঁধতেও পারে
নেত্রী হাঁকায় ছক্কাও। 
নরকেও দেখো জায়গা হবে না
যদি ট্রোল করো, শক খাও!


স্তব

শারদীয় প্রেমিকের প্রস্থানের পর
কথা ছিল
কিশোরীর ঠোঁট থেকে উচ্ছিষ্ট আদ্রর্তাটুকু
এইবার, শুষে নেবে শীত। 

সে আশায় কোল্ড ক্রীমের বিজ্ঞাপনে 
নায়িকা'র খোলা পেট চেটেছে ক্যামেরা 
রাস্তায় উড়েছে ধুলো; ডিসেম্বর বাতাসে
খেজুরে গুড়ের গন্ধেও যেন কোন অদৃশ্য ইঙ্গিত!

তবু এখনো আসেনি শীত (তোমার মতোই সুচতুরা )
এখনো পড়েনি হিম; বোমারু বিমান
ছড়িয়েছে ঘৃণা-বীজ নামহীন মফস্বলে
বিরান জলা'তে; কালাশনিকভ
প্রত্যন্ত শহরের অজস্র দেওয়ালে লিখে গেছে উষ্ণায়ন
লিখে গেছে পরিযায়ী পাখিদের না আসা'র কথা।

ভীষণ কুয়াশা-মাখা এই মৃত্যু-পূর্ণিমায় যদি
তোমার চাঁদের নাম আশাতীত রাখি, প্রিয়তমা
জেনে নিও স্তুতি নয়, স্তব।

22/11/2025

পাকাপাকি

সকালে উঠেই বৌ পাকা গৃহিণীর মতো সুর করে বলল, 'ও গো, শুনছ, তুমি নারকেলগুলো একটু কুরে দিও, রান্নাটা হয়ে গেলে পাকটা আমিই করে নেবো। পরে তুমি নাহয় নাড়ুগুলো পাকিয়ে দিও।  

ভারতের কাছে কাশ্মীর যা, আমার কাছে নারকেল নাড়ুও তাই।  কাজেকাজেই তা নিয়ে কোনো থার্ড পার্টি তা সে কাজি কিংবা পাজি যেই হোক না কেন, কারো পাকনামি মানতে আমি নারাজ।  আমি নিজে নারকেল কুরে নিই, নিজেই পাক দিয়ে নারকেল,  চিনি, শুকনো দুধ, এলাচ ইত্যাদি মেশানো দ্রবণটুকু বানিয়ে, নিজের হাতে নাড়ুও পাকাই।  (নিজেই খাই, অন্তত সিংহভাগ তো বটেই!) কাজেকাজেই বৌয়ের নাপাক অভিসন্ধির কথা শুনে বললাম, 'তুমি কোন পাক-স্থানের মেয়ে এয়েচ যে পাক দেবে! পাকামি করে স্বপাকের কথা না ভেবে বরং খেয়েদেয়ে ছাদে উঠে ক পাক দিয়ে এসো, তাতে পরিপাকও ভালো হবে আর পাকাপাকিভাবে শরীরটাও কমবে। তার মধ্যেই আমার পাক দেওয়া, নাড়ু পাকানো সব হয়ে যাবে। কিন্তু বৌয়েরা আর কবে সোনা ছাড়া বরের কথা শোনে! বর জোর করলে বড়জোর শোনার মেথড অ্যাক্টিং করে মাত্র।  কাজেকাজেই  পাকচক্রে পড়ে আমাকে ধুসস শালা বলে পাকশালা থেকে সরে এসে শালা পাক-দের খেলায় মনোনিবেশ করতে হল। মিনিট দশেক খেলা দেখার পর পাক-স্থলী থেকে বৌ চেঁচালো, 'একবার এসো তো, এ তো পেকে প্রায় লাল হয়ে গেল কিন্তু তবু পাকটা ঠিকঠাক হলো বলে তো মনে হচ্ছে না। পাকিদের বাকি খেলা রেখে আনলাকি আমি আকাবাকি করে গিয়ে দেখি বৌ খুন্তিটাকে ছোট লাঠির মতো ধরে মিশ্রণটার পেটে বেদম খোঁচাখুঁচি করছে। বললাম, 'এ কী! পাক-দণ্ডী দিয়ে বেচারা পাকটাকে অহেতুক দণ্ড দিচ্ছ কেন?' বৌ ঘৌ ঘৌ করে বলল, 'তোমার খুরে দণ্ডবৎ,  এখন আমাকে ব্যঙ্গ না করে পাকটাকে কী করে পাক বানানো যায় সেটা ভাবো।' আমি বললাম, 'এ কি ঘর ওয়াপসি নাকি ডোনাল্ড ট্রাম্প!  পাককে আবার পাক বানাবো কী করে!' বৌ বলল, 'দেখ না, কেমন গুঁড়োগুঁড়ো, ঝুড়োঝুড়ো হয়ে আছে, এ দিয়ে না নাড়ু পাকানো যাবে, না দামি জিনিস ঝাড়ু দিয়ে ফেলে দেওয়া যাবে! 
'জব দো, জব দো' করে রাস্তাঘাটে ঝামেলা পাকানো লোকগুলোকে পুলিশ দিয়ে ঠ্যাঙানোর মতো বৌকে জব্দ হতে দেখার মধ্যেও একটা আলাদাই পৈশাচিক আনন্দ আছে। 
কিন্তু সে আনন্দ তো নেতামন্ত্রীদের আয়ুর মতো পাকাপোক্ত কিছু না, বরং বায়ুর মতো অনুভব করছি কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না গোছের কিছু একটা মেমফুর্তি বটে! কাজেকাজেই আমিও হালকা Sorrow-র অভিনয় করে, বল্লুম, 'সরো তো, দেখি, কী করা যায়! আশা ছিল একটু জল দিয়ে, জ্বাল দিলেই সিন্ধুচুক্তির মতো বেঁড়েপাকা পাকটাকে ম্যানেজ করে নিতে পারব। তবে মনেমনে জানতাম, যতই মিনিট পাঁচেক অন্তর কথায় কথায় 'গো' 'গো' করে বেচারা বরদের আশেপাশে গোঁত্তা খাক না কেন, বৌ-রা মোটেও গোবেচারা হয় না। আপাতত ল্যাজেগোবরে হয়ে গেছে বলেই সিঁড়িতে বসেবসে জুলজুল করে চেয়ে দেখছে বটে কিন্তু এরপর আমিও ধ্যাড়ালে হুল ফোটাতে কার্পণ্য করবে না। তাই
খানিক সাবধানে দ্রবণটার মধ্যে বেশ খানিকটা জল ঢেলে আবার আঁচে চড়িয়ে ফোটাতে শুরু করলাম। খানিক ফোটার পরই বোঝা গেল, পাক এবার সোজা রাস্তায়, আই মিন গোটা বাঁধার মতো অবস্থার দিকে আসছে। বললাম,  'চেখে দেখো, প্রয়োজনে খানিকটা মেখেও দেখতে পারো। তোমার ঝুড়ো পাক খানিক ঘুরে এসে কেমন আঠা আঠা হয়ে গেছে।' বৌ কাছে এলে খানিক মিশ্রণ হাতে নিয়ে, পাক দিয়ে নাড়ু পাকিয়ে তার নাকের কাছে ধরলাম। 'ঘি, এলাচ এসবের গন্ধ পাচ্ছ?' বৌ নাক দিয়ে গন্ধ শুঁকল বটে তারপর 'হুহ্' বলে হুহ্কার তুলে তোয়ালে, নাইটি নিয়ে বাথরুমের দরজা বন্ধ করল। ঢোকার আগে রাগে গজগজ করতে করতে গেল,  ' কুচো নিমকিতে তাহলে আমি আর হাত দিচ্ছি না!'



ছাপোষা সিরিজ


প্রেম নেই।  ডি.এ নেই। না পুজোতে পোকা
চিপসের প্যাকেটেও বারোআনা ধোঁকা

জীবন এখন গাধা; কুঁজো পিঠে বোঝা
কিংবা নেড়ির পিছে ফুলঝুরি গোঁজা। 

হয়নি পাহাড়ে যাওয়া, সুখী গৃহকোণে
সাগর, পাহাড় দেখি বসে স্মার্টফোনে। 

বুকনি ও বাণী দেখি, চুপিচুপি আর
দেখি, পোঁদ নেড়ে নাচে টিকটক স্টার।

না উপরে মেঘ আছে না নিচুর চাপ
কালী পুজো খালি যাবে বলেছে আ.বা.প।

বন্ধুরা কাছে নেই বুঝি সেই পাপে
একাএকা ঢেউ গুনি সিক্সটি-র মাপে। 

প্যান্ডেলে বাজি পোড়ে। ছাদে ওড়ে ফানুস।
মা মা বলে নাক ধরে ডাক পাড়ে শানু। 

20/11/2025

রাজকাহিনী

রাজকাহিনী

কেও ভালবাসে মাছ‚ কেউ আলুপোস্ত
খাদ্যরসিক হলে চট পেতে বোস তো

কেউ ভালবেসে যদি মেনু ভুলে আঁশ খায়
কেউ আরো অহিংস, শুধু কাঁচা ঘাস খায়

মামনি'রা হট, ওরা ফুচকা'তে ঝাল খাক
প্রাইমারি মাস্টার "মিড ডে'র মাল খাক

আঁতেলেরা বার খাক, বিরোধী'রা ক্যালানি
মন্ত্রীরা দেশ খাক, পুলিশেরা প্যালা নিক

পাঁঠা খাক ব্রাহ্মণে‚ গোরু খাক দলিতে
মেয়েদের লাশ খাক হায়না'রা গলি'তে

জেহাদের গ্যাস খাক মুসলিম ভায়ে'রা
মা দুগগা পূজা খাক, লাথি খাক মায়ে'রা

বেশ্যার লেগপিস, কালচার-পাখনা
মেনুকার্ড দেখে‚ যে যা ভালবাসে, খাক না।

খাওয়াই আসল‚ বস‚ খিদে ধ্রুব সত্যি
অন্যের খাওয়া দেখে তোর কী আপত্তি?

কেন শুধু শুধু তুই মরছিস হামলে?
আয় না‚ খাওয়াতে ফিরি গোলযোগ থামলে

তা না যদি ফিরিস, তো বলে দেব বানিয়ে
খাদ্যরসিক নোস, চোখ ছিল পানীয়ে!!

19/11/2025

নবুজ্যেঠুর কাশ্মীরি কম্বল

নিশি-কাকিমার মেয়ে শিউলিকে দেখতে এসেছে সাঁইথিয়ার এক পার্টি। সাঁইথিয়া বড় শহর। জংশন। সাঁইথিয়ার বেনেদের এক ডাকে সারা জেলা চেনে।  ছেলেরও প্রপার সাঁইথিয়ার বাজারে ইয়া বড় নটকোনার দোকান। ছেলের পিসির বিয়ে হয়েছে নিশি কাকিমাদের বাবার বাড়ির গ্রামেই। সেই সূত্রেই যোগাযোগ।  ছেলের গায়ের রঙ একটু শ্যামলার দিকে আর বয়সও নেহাতই একটু ভারি, নাহলে শিউলি কাকিমা-দের এ ছেলেকে ধরার সাধ্যই হতো না। অবশ্য ছেলের পিসি পইপই করে বলে দিয়েছিলেন, বন্ধুদের নিয়ে নিজের গাড়ি করে ভাইপো মেয়ে দেখতে যাবে।  ছেলের খাতিরসম্মান যেন নিশি কাকিমা ঠিকঠাক করে। একেবারে ফাঁকা হাতে মেয়ে নেওয়া যদিও তাদের বেনেদের বংশে বারণ। তবে ভাইপোর মেয়ে পছন্দ হয়ে গেলে দেওয়াথোওয়ায় খুব একটা আটকাবে না।

এদিকে কাকিমা সহায়সম্বলহীন বিধবা। কাজেকাজেই কনে দেখানোর সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়েছিল পাড়ার ছেলেমেয়ে মানে আমাদের ঘাড়ে। দায়িত্ব মানে প্রতিবেশী নবুজ্যেঠুর ঘর থেকে সুদৃশ্য কাশ্মিরি কম্বল এনে বড় ঘরটায় পেতে দেওয়া, একটা টেবিল ফ্যানের ব্যবস্থা করা, মহাদেব মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে মিষ্টি, সিঙাড়া ইত্যাদি টুকটাক কেনাকাটা,  কনে সাজানো, এমন কী যে জানালার পাশে বসে কনে দেখানো হবে তার বাইরে থেকে কনে দেখা আলোর জন্যে সূর্যের আলোর অভাবে অল্টারনেটিভ আলোর ব্যবস্থা করা - মানে এ টু জেড সবই আমাদের দায়িত্ব।

মালো পাড়ার গোটা পাঁচেক আধা ন্যাংটা ছেলেকে লেজে খেলাতে খেলাতে নিয়ে এসে একটা বোলেরো গাড়ি দুর্গাতলার নিমগাছটার তলায় পার্ক করতেই আমাদের ব্যস্ততা শুরু হল। সন্দীপ গিয়ে পাত্রপক্ষের লোকদের ওয়েলকাম করে নিয়ে এল। পাত্রপক্ষ বলতে চল্লিশ ছুঁইছুঁই  এক নাদুসনুদুস ভদ্রলোক, আর তার চেয়েও বেশী নাদুসনুদুস গোটা তিনেক বন্ধু। 
গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পা-ধোওয়ার জন্যে জল দেওয়া হলো। খানিক 'হেঁহেঁ' কিছু আচ্ছা আচ্ছা'র কিছুক্ষণ পরেই কাকিমার ছোটমেয়ে ছিমলি  সপারিষদ পাত্রের সামনে ঠাণ্ডা পানীয়,  তারপর পরম্পরা মেনে মিষ্টি, সিঙাড়া, নিমকিতে সুসজ্জিত প্লেট নামিয়ে দিয়ে এল।
 
ওদিকের পাশের ছোট ঘরটাতে তখন শিউলিকে ভদ্রস্থ করে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মিনু-বৌদি আর পাড়ার উড বি বিউটিসিয়ান দীপা।
পাড়ার গুরুজনেরা মানে গোটা দুই ঠাকুমা,  জনা চারেক কাকিমা, আর ছ-পিস বৌদি সহ আত্মীয়, প্রতিবেশীদের ভীড় বাইরের বারান্দায় বসে ফিসফিস করছে। লাল্টু কাকু বরাবর এসব ব্যাপার ম্যানেজ করতে ওস্তাদ। একফাঁকে কখন স্যাট করে ঘরে ঢুকে পাত্রপক্ষের সামনে এক প্যাকেট উইলস ফ্লেক্ আর মৌরি-র একটা প্লেট নামিয়ে দিয়ে চলে এসেছেন।


ঠিক তখনই নবুজ্যেঠু এলেন। কারো কারো আসাকে আসা বললে বোধহয় অপমান করা হয়। আগমন,  বা উপস্থিত হওয়া বললে যদি বা কিছুটা বোঝানো যায় কিন্তু তাদের উপস্থিতির গুরুত্ব কিংবা পরিস্থিতির উপর তাদের আগমনের প্রভাবটুকু সম্পর্কে পুরোপুরি বোঝানো যায় না। বরং ইংরেজিতে ল্যান্ডিং বললে হয়তো সেই আগমনের মাহাত্ম্যের  কাছাকাছি যাওয়া যেতে পারে। নবুজ্যেঠুর সেই ধরণের লোক। জ্যেঠুকে দরজায় ঢুকতে দেখেই সন্দীপ বিড়বিড় করে বলল, 'গাঁঃ মাঃ গ্যাঃ!' এই আপাত অর্থহীন শব্দসমষ্টির অর্থের চেয়েও এদের জন্মের আখ্যান বেশি ইন্টারেস্টিং।  তরুণ সঙ্ঘের নাটক বা যাত্রা দলের অভিনেতা,  অভিনেত্রী সময়ের সাথে পালটে গেলেও প্রম্পটার পালটায় না। সন্দীপ সেই কবে থেকে প্রম্পটের কাজ করতে করতে লক্ষ্য করেছে যাত্রা বা নাটকের বইয়ের নীচের দিকে পৃষ্ঠাসংখ্যার সাথে সংক্ষিপ্ত আকারে যাত্রা বা নাটকের নামও লেখা থাকে। যেমন পালার নাম ঘুমাও তুমি প্রিয়া হলে বইয়ের অষ্টম পাতায় লেখা থাকবে ঘুঃ তুঃ প্রিঃ ৮। পালার নাম চোরের দাদা নালক হলে বইয়ের ৬৯ পাতায় লেখা থাকবে চোঃ দঃ নাঃ ৬৯। ফলে এখন সন্দীপ তার এই অভিজ্ঞতাকে নিজের স্কিল ডেভলপমেন্টের কাজে লাগিয়েছে। ফলতঃ এখন আর তাকে বয়স্কদের সামনে তুচ্ছ কারণে স্ল্যাংগুয়েজ বলে ফেলার জন্যে ঝাড় খেতে হয় না। 


সে যাই হোক, জ্যেঠু তো এলেন। এবং আসামাত্রই জিজ্ঞেস করলেন, -হ্যাঁ রে লাল্টু, তা পাত্র কুন ঘরে বস্যাছে?' 
লাল্টুকাকা বাজারের চৌমাথায়  দিল্লি চলো-র পোজ করে থাকা সুভাষ বোসের স্ট্যাচু-র মতো আঙুল তুলে দেখাতেই নবুজ্যেঠু গান্ধীর মতো লাঠি ঠুকতে ঠুকতে পাত্রের সঙ্গে মোলাকাতের জন্যে এগিয়ে গেলেন। 

যদিও নবুজ্যেঠুকে আমরা জ্যেঠুই বলি কিন্তু এ নিয়ে সকলেই আমরা বেশ কনফিউজড। শুধু আমি কেন, বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনিও একইরকম কনফিউজড হয়েই জ্যেঠু বলতেন। একবার রতন ফিচলেমি করে জিজ্ঞেস করাতে নবুজ্যেঠু উত্তর দিয়েছিলেন, 'শুধু বাবা বুলিস না। বাদবাকি যা বুলি  ডাকবি,  ডাক। বুড়ো বয়সে উটকো ছেল্যা-র ঝামেলা আমার পুষাবে না।' তারপর থেকে ও প্রসঙ্গে নিয়ে আলোচনা কিংবা টীকাটিপ্পনী থেকে আমরা শত-হস্ত দূরে। ভদ্রলোকের বয়স আশি নব্বই হবে। একশ দেড়শ হওয়াও বিচিত্র নয়!  তবে বয়সের পক্ষে এখনো যথেষ্ঠ মজবুত। লাঠি নিয়ে একটু কুঁজো হয়ে হাঁটেন বটে কিন্তু এখনও চশমা নেননি। কন্ঠস্বরেও বার্ধক্যজনিত কোন বিকৃতি নেই। ছেলেপুলে হয়নি, স্ত্রীও বেশ কয়েক বছর আগেই ধরাধামের মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন। নবুজ্যেঠুই কেবল পঞ্চাশ ষাট বিঘে জমিজমা আর মহেঞ্জোদারো মার্কা একটি পাকা দালান নিয়ে প্রতিবেশীদের হিংসের মুখে ছাই দিয়ে রাহুল দ্রাবিড় সুলভ দৃঢ়তা নিয়ে টুকটুক করে ব্যাটিং করে যাচ্ছেন তো যাচ্ছেনই।
তবে হ্যাঁ, জ্যেঠু কিন্তু লোক মন্দ নন। মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সত্‍ পরামর্শ দেওয়া, এমন কী প্রয়োজনে নিজের মড়াই ভেঙে ধানচাল দিতেও কার্পণ্য করেন না বলে শুনেছি। দোষ বলতে ওই মুখের উপর  আনখাই রকমের স্পষ্ট কথা বলা। তবে সেই স্পষ্টকথা যে কী চিজ তা আমরা সেদিন আবার নতুন করে টের পেলাম।

বসার ঘরে অভ্যাগতরা তখন কেউ মিষ্টির প্লেটে নিমগ্ন,  কেউ আবার সেই সিঙারা, মিষ্টির প্রাথমিক স্টেজ পার হয়ে মৌরি চিবুতে চিবুতে জুত্‍ করে সিগারেট ধরিয়েছেন। 

ঠিক সেই ব্রাহ্মমুহূর্তেই নবুজ্যেঠু সটান পাত্রপক্ষের ঘরে ঢুকে গেলেন। অন্য কেউ হলে ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা কটু ধোঁয়ার মেঘ দেখে একটু থমকে দাঁড়াতেন। পারতপক্ষে ঢোকার আগে কমসে কম একটা গলা খাঁকারি মেরে একটা লাস্ট ওয়ার্নিং গোছের মেসেজও পাঠাতেন। কিন্তু এসব বাহুল্য নবুজ্যেঠুর নেই। ঘরে ঢুকেই স্যাট করে একটা একটা চেয়ার টেনে নিয়েই,  সেই পরিচিত পিত্তি জ্বলানো স্টাইলে ঈষৎ হেসে, জিজ্ঞেস করলেন' 'তা বাবা তুমাদের মধ্যে পাত্র কুনজন?
-এই যে সার, আমি, পাত্রের নিরাসক্ত কিন্তু আত্মবিশ্বাসী উত্তর।
-অ! তা তুমিই পাত্র! ভাল! তা বাবাজীবনের নাম কী?
গাণ্ডেপিণ্ডে তেলেভাজা আর মিষ্টি গিলে টোকো মুখে সিগারেট ধরানোর প্ল্যান ভেস্তে যাওয়াতে পাত্র খানিক রাগতস্বরেই উত্তর দিলেন
-সাধন, সাধন দত্ত। 
অন্য যেকোনো লোক হলে পাত্রের ভ্রুভঙ্গিতে  ফুটে ওঠা মুখে পচা বাদাম পড়ার মতো বিরক্তভাবটা পরিস্কার দেখতে পেতেন। কিন্তু জ্যেঠু ওসব পাত্তাই দিলেন না। 

বাঁদিকে বসে থাকা এক বন্ধু অবশ্য নবুজ্যেঠু ঘরে ঢোকার আগেই সিগারেট ধরিয়েছিলেন। এখন সিগারেটের ধোঁয়া লুকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টায় ডানহাতটাকে অদ্ভুতভাবে নাড়াচ্ছিলেন।
 -'ই বাবা! কীরম ম্যাজিক দ্যাখাছো,  দ্যাখো! কিছু ভ্যানিশ ট্যানিশ হবে নাকি!  বলেই হাসতে হাসতে নবুজ্যেঠু আবার মুণ্ডুটা বন্ধুর দিক হতে পাত্রের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ভাববাচ্যে জিজ্ঞেস করলেন 
- তা সাধন বাবাজীবনের বয়স কত হল? 
উফফফ! আবার প্রশ্ন!  এ শালা ত্যাঁদড়, গাঁইয়া বুড়ো তো জ্বালিয়ে মারলে! 
ব্যবসায়ী সাধন দত্ত এবার বেশ আক্রমণাত্মক। সে শহুরে ব্যবসায়ী লোক। এরকম কত টেঁটিয়া লোককে সে দিনরাত হ্যাণ্ডল করে। এক গ্রাম্য বৃদ্ধকে সমঝে দেওয়ার জন্যে চেহারায় একটা ভারিক্কি ভাব আর কণ্ঠস্বরে একটা গাম্ভীর্য এনে, নবুজ্যেঠুকে উপেক্ষা করে, কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন
-থার্টি প্লাস।
কথাটা বলেই মনেমনে সাধনবাবু 
একচোট হেসে নিলেন। এরপর আশা করি বুড়ো আর বেগড়বাঁই করতে আসবে না। এবার বুড়ো কেটে পড়লেই সিগারেটটা ধরানো যাবে। তবে শালা, মহা খচ্চর লোক বটে মাইরি! 

- তা কত প্লাস বাবাজীবন?

-অ্যাঁ....আ...আ!  
এতক্ষণ যে কল্পনার আকাশে কাটা ঘুড়ির মতো পৎপৎ করে উড়ছিলেন সাধন দত্ত সেখান থেকে এক ধাক্কায় আবার তিনি বাস্তবের খড়ের গাদায় এসে ধপাস করে আছাড় খেলেন। 
 - আ-আ -মা-কে ক-ক-কি-কিছু বলছেন? সাধন দত্তের আত্মবিশ্বাসের তখন খুব করুন দশা। 

-হ্যাঁ মানে জিজ্ঞেস কচ্ছি থার্টির সঙ্গে কত প্লাস দিব, বাবা? এক, দুই, তিন নাকি সাত, আট, নয়, কত প্লাস দিব?
চাতরা গনেশলাল বিদ্যামন্দির থেকে ঊনিশ শো সাতান্ন সালে  তাদের ব্যাচের একমাত্র আই.এ পাস করা নবুজ্যেঠুর কন্ঠস্বরে সেই চিরাচরিত ব্যঙ্গ আর দৃঢ়তার মিশেল। দত্তের আজকেরই  কামানো চকচকে কালো গালে কে যেন আরেক পোঁচ কালি লেপে দিয়েছে। সপারিষদ সাধন দত্ত ঠিক করে উঠতেই পারছেন না এই কথায় রেগে খিস্তি করা উচিৎ নাকি হেসে এবারের মতো প্রেস্টিজের পাংচার হওয়াটা ম্যানেজ করে নেবেন নাকি শেষমেষ একেবারে মা গো বলে কেঁদেই ফেলবেন। 

হঠাৎ কোঁৎখরফরাৎক্ষক' বা এর কাছাকাছি শুনতে একটা অদ্ভুত শব্দে ঘরের মধ্যে বিরাজ করা কয়েক সেকেন্ডের শ্মশানের নীরবতা ভাঙলো। এই অভাবনীয় পরিস্থিতিতে গলায় সিগারেটের ধোঁয়া আটকে ছেলের এক বন্ধুর চোখমুখ দাঁড়িয়ে গেছে। কাশতে কাশতে চোখ থেকে অবিরাম জল ঝরেই যাচ্ছে। থতমত খেয়ে বন্ধুটি যেই সিগারেটটা অভ্যাবশতঃ নিচে গুঁজে নেভাতে যাবেন, অমনি আবার... 
আকস্মিক দুর্ঘটনার মতো, আচমকা ঢেয়ে আসা অঙ্কস্যারের বিরাশি (তিরাশি বা চুরাশি হলেই বা আটকাচ্ছে কে!) সিক্কার চড়ের মতো আবার নবুজ্যেঠুর স্পষ্টবাদিতার ঝোলা থেকে বের হয়ে এল নবতম পাশুপাত্‍ 

-ওই সিগারেটটার দাম মেরেকেটে তিন চারটাকা তো হবেই, নাকি বাবাজী? আর আমার এই কাশ্মিরি কম্বলখান দেখছ, গতবছর পোদ্দারদের বড় ব্যাটা যেটো মিলিটারিতে কাজ করে অকে দিংই আনালছি বুঝল্যা কিনা। ট্যাঁক থেকি পাক্কা তিন হাজার দু শো টাকা খোস্যাছে। তুমি যেখানে গুঁজছো সেটো মাটি লয় বাপ, আমার কম্বল। উখানে গুঁজা আর আমার পেছনে গুঁজা সুমান, বাপ। তাছাড়া  একসঙ্গে সিগারেট আর কম্বল দুট্যাকেই নষ্ট করে কী লাভ, বাপধন? এট্টু জল খেং ল্যাও  এট্টু সামলিং ল্যাও, তারপর নাহয় … 
বলে সাধনের দিকে ঘুরে
- আচ্ছা বাবাজি, আজ উঠি। ঘরে মেয়াছেল্যা নাই, সন্ধ্যা আমাকেই জ্বালতে হবে। তবে বয়সের কথাখ্যান স্ক্যামই মুনে হছে বুঝল্যা। নোয়াপাতি নুদিখ্যান যা বাগালছ, মুনে হছে থার্টির সঙ্গে বারো চোদ্দ প্লাস না দিলে ঠিকঠাক বয়সের হিস্যাব পাওয়া যাবে না। যাগগা, আজ চলি। চলি রে লাল্টু। গেল্যাম গো শিউলি-র মা। 

তারপর কনে-দেখার এপিসোডটা আর তেমন জমেনি। হুঁহুঁনানা করতে করতেই মিনিট পনেরোর মধ্যেই শিউলিরানীর উপস্থিত বুদ্ধি এবং সৌন্দর্যের ত্রয়োদশতম পরীক্ষা শেষ হয়েছিল। আরেক দফা চা পানের প্রস্তাব বেশ দৃঢ়ভাবে  প্রত্যাখ্যান করে হনহন করে গাড়ির দিকে হাঁটা দিয়েছিলেন সপারিষদ সাধন দত্ত।

-আমরা বাড়িতে গিয়ে আলোচনা করি , তারপর ফোন করে জানাব।  গাঁইগুঁই করতেকরতে গাড়িতে উঠে যাওয়ার আগে এটাই ছিল থার্টি প্লাস সাধন দত্তের পার্টিং ওয়ার্ড।

তবে সে ফোন যে আর কখনোই আসেনি সেটা বলাই বাহুল্য!

#পীযূষ কান্তি বন্দ্যোপাধ্যায়